ব্রেকিং নিউজ
হাসিনাকে ঘিরে আটকে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিকের উদ্যোগ, অচলাবস্থা কাটবে কীভাবে?

হাসিনাকে ঘিরে আটকে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিকের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে আবারও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুনরায় শুরু এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নীরব আলোচনা চললেও ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সেই উদ্যোগে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি, তার ছেলে এবং আওয়ামী লীগের নেতারা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সমালোচনা করেন। এরপর ভারতের ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগে থেকেই নয়াদিল্লিকে সতর্ক করা হয়েছিল, ভারতের মাটি ব্যবহার করে এমন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো উচিত নয়, যা দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের চেয়ে ভারতের মাটি থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টিই তাৎক্ষণিক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নয়াদিল্লিতে সাবেক বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, বর্তমান অচলাবস্থার মূল কারণ শেখ হাসিনাকে ভারতে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ বা ‘মেগাফোন’ সুবিধা। প্রত্যর্পণের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, ভারতের সঙ্গে ঢাকার লক্ষ্য হলো আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা। তবে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে এবং ভারতকেও সেই পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকুক, সেটিও বাংলাদেশ চায় না। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় বাংলাদেশ। পরে তার মৃত্যুদণ্ডের পরও সেই অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং অগ্রগতি হলে বাংলাদেশকে জানানো হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণ শুধু শেখ হাসিনা নন। বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, সীমান্ত এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ একই সময়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, যা ভারতের কৌশলগত হিসাবেও প্রভাব ফেলছে।

এরপরও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার সুযোগ সীমিত। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, ব্যাপক বাণিজ্য ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের বাণিজ্য ও কিছু পর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য ভারতের আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক চাওয়ার কথা বলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাতে শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার সমাধান গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য তারেক রহমানের ভারত সফরও বৃহত্তর সমঝোতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *